বিশেষ শিশু দের জন্য কিছু ডায়াগনস্টিক টেস্ট

গবেষণায় দেখা গেছে অনেক অটিস্টিক ও হাইপার একটিভ বাচ্চার শরীরে বিশেষ কিছু শারীরবৃত্তিও সমস্যা দেখা যেতে পারে। যার মধ্যে প্রধান হচ্ছে শরীর থেকে খাবার বা অন্যান্য মাধ্যমে গৃহীত ক্ষতিকারক মেটাল যেমন লেড, মার্কারি ইত্যাদি বের করে দিতে না পারা, অন্ত্রে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বেড়ে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা, ভিটামিন এর অভাব, কিছু কিছু খাদ্য পরিপাক করতে না পারা, কিছু কিছু খাবার বা খাদ্য উপাদানের প্রতি অতি সংবেদনশীলতা ইত্যাদি। এই সব কারনে বাচ্চার আচরনে যেমন পরিবর্তন আসতে পারে, তেমনি সঠিক কারণ নিরুপন করে সেই মোতাবেক চিকিৎসা নিলে অনেকেরই অটিস্টিক ও  হাইপার একটিভ সিম্পটম সমূহের প্রভূত উন্নতি হতে দেখা যায়।

এবার আমরা কিছু ডায়াগনস্টিক টেস্ট এবং সেগুলি কেন করা হয় তা নিয়ে আলোচনা করবঃ

Complete Blood Count (CBC) and Comprehensive Metabolic Panel (CMP) – সাধারণত এই টেস্ট গুলর মাধ্যমে বাচ্চার এনিমিয়া, অণুচক্রিকার সংখ্যা (বেশি অণুচক্রিকা শরীরে প্রদাহ নির্দেশ করে), লিভার ও কিডনি ঠিক মত কাজ করছে কিনা দেখা হয়ে থাকে।

Thyroid – বেশ ভাল পরিমান অটিস্টিক বাচ্চার হাইপো-থায়রয়ডিজম থাকে, যার কারনে কিছু অটিস্টিক সিম্পটম বেড়ে যায় এবং বাচ্চার বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়। TSH নামক একটি সাধারন রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত হওয়া যায় এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে বাচ্চা অনেক উপকৃত হয়।

Iron deficiency – শরীরে আয়রন এর ঘাটতি থাকলে অমনোযোগ ও কোন কাজে মন সংযোগের ব্যাঘাত ঘটে। গবেষণায় আয়রন এর ঘাটতি এর সাথে কম বুদ্ধিমত্তার (lowered IQ) সংযোগ প্রমানিত হয়েছে। আয়রন এর অভাব জনিত সমস্যায় ভোগা অটিস্টিক বাচ্চাদের আয়রন খাইয়ে তাদের ঘুমের সমস্যার উন্নতি দেখা গেছে এবং হাইপার একটিভ বাচ্চাদের মনঃসংযোগের উন্নতি ঘটতে দেখা গেছে।

Ammonia and lactic acid – এই দুটি উপাদান টেস্ট করার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারব বাচ্চার শরীরে শক্তি উৎপাদনের (মাইটোকন্ড্রিয়া) ব্যাবস্থায় কোন সমস্যা আছে কিনা। এই সমস্যা থাকলে বাচ্চার শরীরে কম শক্তি উৎপাদন হয় এবং মাংশ পেশির সবলতা কম থাকে। এবং এটি কমানোর জন্য সহজ কিছু ঔষধ ব্যবহার করে উন্নতি দেখা যেতে পারে।

Cholesterol – এর অভাভ হলে বাচ্চার মধ্যে অনেক সময় অতি রক্ষণশীলতা ও সহ্য ক্ষমতার অভাব দেখা দেয়। যাদের শরীরে এই Cholesterol কম থাকবে তাদের বাইরে থেকে খাবার বা ঔষধের মাধ্যমে Cholesterol দিলে তারা উপকৃত হতে পারে।

Cysteine – এই উপাদান টি দেহে গ্লুটাথায়নের পরিমান নির্দেশ করে। কম Cysteine থাকা মানে হল কম গ্লুটাথায়নের উপস্থিতি। গ্লুটাথায়ন আমাদের শরীর কে ডি-টক্সিফিকেশন করে এবং শরীর থকে ক্ষতিকারক ফ্রি-র‍্যাডিকেল কমিয়ে দেয়। তাই Cysteine কম থাকলে খাবার অথবা ঔষধের মাধ্যমে গ্লুটাথায়নের উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করা যেতে পারে যাতে বাচ্চা বিশেষ ভাবে উপকৃত হবে।

Lead – Mercury –  এই গুল হেভি মেটাল নামে পরিচিত যা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অনেক অটিস্টিক ও হাইপার একটিভ বাচ্চার শরীরে এই মেটাল গুলর আধিক্য দেখা যায় এবং যার কারনে তাদের আচরনে ও তা পরিলক্ষিত হয়। যদি বাচ্চার দেহে উচ্চ মাত্রায় Lead – Mercury ইত্যাদি পাওয়া যায় তাহলে তাদের শরীর থেকে তা বের করার চেষ্টা করতে হবে। যাদের দেহে Lead – Mercury এর পরিমান বেশি আছে, এমন বাচ্চাদের চিলেসন থেরাপি দিয়ে তাদের শরীর থেকে সেগুল বের করে দিলে তাদের সিম্পটম এর উন্নতি ঘটতে পারে।

Magnesium আমাদের শরীরে প্রশান্তি ও ধীর স্থির ভাব আনে। আর অটিজম ও হাইপার একটিভ বাচ্চাদের দেহে Magnesium এর ঘাটতি পাওয়া যায় বলে গবেষণায় দেখা গেছে। গবেষণায় দেখাগেছে, যাদের Magnesium এর ঘাটতি আছে, তাদের Magnesium খাইয়ে হাইপার এক্টিভিটি এবং অন্যান্য কিছু অটিস্টিক আচরণ কমানো সম্ভব।

Testosterone – অল্প কিছু অটিস্টিক বাচ্চার মধ্যে Testosterone বেশি থাকতে দেখা যায় যার কারনে তার মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণ প্রকাশ পায়।

Urinary porphyrin concentrations -এই টেস্ট এর মাধ্যমে শরীরে হেভি মেটাল যেমন Lead – Mercury, খাবারের মাধ্যমে গ্রহন করা কীটনাশক ইত্যাদির আধিক্য আছে কিনা বুঝা যায়। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে বাচ্চার জন্য খুবি উপকার পাওয়া যেতে পারে।

IgG Food allergy test –  এর মাধ্যমে আমরা বাচ্চার কোন খাবারের প্রতি অ্যালার্জি আছে তা জানতে পারি।

Comprehensive Stool Analysis – এর মাধ্যমে আমরা দেখতে পারি বাচ্চা কি কি ধরণের খাবার পরিপাক করতে পারছে আর কি পারছে না। সেই সাথে Stool এর মধ্যে কি ধরণের ব্যাকটেরিয়া বেশি ইত্যাদি জানা যায় এবং কোন সমস্যা থাকলে তার চিকিৎসা করা যায়।

উপরোক্ত টেস্ট গুলই যে একমাত্র টেস্ট তা নয়। বাচ্চার আরও বিভিন্ন সমস্যার জন্য বিভিন্ন টেস্ট চিকিৎসক করে থাকেন। আবার সব বাচ্চারই যে উপরের টেস্ট গুল দরকার হবে তা ও না। এটা নির্ধারণ করবেন অটিজম বা হাইপার একটিভ এর বায়ো-মেডিক্যাল চিকিৎসক অথবা শিশু বিশেষজ্ঞ এর উপর। বাচ্চার অটিজম বা হাইপার একটিভ এর বায়ো-মেডিক্যাল চিকিৎসায় এই টেস্ট গুল গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে। যারা দেশের বাইরে যেমন সিঙ্গাপুর, ভারত ইত্যাদি দেশে বাচ্চা কে দেখিয়েছেন, তাদের অনেকেই হয়ত এই টেস্ট গুল করে থাকবেন। আমাদের দেশে এর বেশিরভাগ টেস্টই হয় না। তবে আপনারা জেনে খুশি হবেন অটিজম বিডি ও ইন্সিটিউট অফ নিউরো-ডেভলপমেন্ট এন্ড রিসার্চ, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি ল্যাব কে অনুরোধ করে বাংলাদেশে এই টেস্ট গুল করানোর ব্যবস্থা নিয়েছে। আশা করি এর ফলে আমরা আরও নির্দিষ্ট ভাবে অটিজম ও হাইপার একটিভ এর বাচ্চাদের চিকিৎসার দিকনির্দেশনা দিতে পারব।

এই ব্যাপারে আপনাদের কোন জিজ্ঞাসা থাকলে নিচের কমেন্ট সেকশন এ লিখতে পারেন, অথবা অন্য যে কোন বিষয়ে আমাদের ফোরাম পেজ এ প্রশ্ন করতে পারেন। সবাই ভাল থাবেন, ধন্যবাদ।

ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ওসমান, পোষ্ট গ্রাড, নিউরো রিহ্যাব (ইউ কে), প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ সোসাইটি অব নিউরো-ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিসার্চ ট্রাস্ট। ০১৯৩১৪০৫৯৮৬